নীরবতার ভেতরেই আমার পূর্ণ উচ্চারণ- ফারজানা লিজাঃ
আমি স্বভাবতই কম কথা বলি। এই কম কথা বলা কোনো অভিমান নয়, কোনো দুর্বলতার চিহ্নও নয়। আমার নীরবতা মানুষভেদে বদলে যায়—কে আমার কাছে কতটা আপন, তার ওপরেই নির্ভর করে আমার শব্দের পরিমাণ। যাদের আমি আপন ভাবি, যাদের উপস্থিতিতে মন খোলা আকাশের মতো হয়, তাদের সামনে আমি অবিরাম কথা বলতে পারি। আর বাকিদের কাছে আমি নীরব থাকি—সচেতনভাবে, সম্মানের সাথেই।
কিন্তু এই নীরবতাই অনেকের চোখে আমাকে নানা বিশেষণে বাঁধে। কেউ আমাকে ‘মুডি’ বলে, কেউ ‘অহংকারী’ ভাবে, কারও কাছে আমি হয়তো দূরত্ব তৈরি করা এক রহস্যময় মানুষ। তারা জানে না—আমি সবার সাথেই হাসিমুখে কথা বলি, কেবল নিজের একটি সীমা রেখেই। সেই সীমা কোনো প্রাচীর নয়; এটি আমার আত্মরক্ষার রেখা, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি না।
আমি সবার সাথে নিজেকে মেলে ধরতে পারি না। কারণ আমার শব্দগুলো সবার জন্য নয়। কিছু কথা আছে, যা কেবল নির্দিষ্ট মানুষের কাছেই নিরাপদ। কিছু অনুভূতি আছে, যা ভিড়ের মাঝে উচ্চারণ করলে তার মান নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি বেছে নিই—কাদের কাছে আমি খুলে যাব, আর কাদের কাছে আমি নীরব থাকব। এই বাছাই কোনো অহংকার নয়; এটি আত্মসম্মানের স্বাভাবিক প্রকাশ।
যাদের আমি ভালোবাসি, যাদের আপন মনে করি, তাদের সামনে আমি এক অন্য মানুষ। সেখানে আমি নির্ভার, উচ্ছল, কথা দিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারি। সেখানে আমার নীরবতা ভেঙে পড়ে, শব্দেরা মুক্তি পায়। আর যারা সেই বৃত্তের বাইরে, তাদের কাছে আমি হয়তো সেই ‘অহংকারী’ মেয়েটাই রয়ে যাই। তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ সবাইকে আপন বানাতে গিয়ে নিজেকে হারানোর চেয়ে, অল্প কিছু মানুষের কাছে সত্য হয়ে থাকাটাই আমার কাছে অনেক বেশি দামী।
এই লেখা আসলে একটি দর্শনের কথা বলে—নিজেকে সবার জন্য সহজ করে তোলার দর্শন নয়, বরং নিজের মতো থাকার দর্শন। এখানে শেখানো হয়, সবার কাছে প্রিয় হওয়া কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। জীবনে কিছু ভুল বোঝাবুঝি থাকবেই, কিছু অপবাদ থাকবেই। কিন্তু তার বিনিময়ে যদি নিজের আত্মপরিচয় অক্ষুণ্ন থাকে, তবে সেই মূল্য খুব বেশি নয়।
নীরব মানুষদের ভুল বোঝা হয় সহজে। কারণ তারা উচ্চস্বরে নিজেদের ব্যাখ্যা দেয় না। কিন্তু নীরবতার ভেতরেই থাকে গভীরতা, থাকে সংযম, থাকে অনুভবের প্রাচুর্য। এই লেখা সেই নীরব মানুষের পক্ষেই দাঁড়ায়—যারা কম বলে, কিন্তু সত্য থাকে; যারা ভিড় এড়িয়ে চলে, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতায় ডুবে যায়।
শেষ পর্যন্ত এই কথামালা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক গভীর সত্য—জীবনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকা। নিজের সীমা, নিজের নীরবতা, নিজের নির্বাচনের প্রতি সৎ থাকা। আর সেই সততাই এই লেখাকে শুধু একটি লেখা নয়, বরং এক দৃঢ় আত্মঘোষণায় রূপ দেয়।